Posts

Showing posts from November, 2017

ভাবসম্প্রসারণ : যে জাতি জীবন হারা অচল অসার, / পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার

যে জাতি জীবন হারা অচল অসার, পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার যে জাতি গতিহীন, সে জাতি যেন ঝড় পদার্থের মতো। জাতিকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলতে হলে গতিশীল চেতনা ও আদর্শ দরকার। জীবনে গতি না থাকলে জীবনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। গতি বা পরিবর্তন জীবনের লক্ষণ। গতির যে পরিবর্তন আসে তাতে জীবনকে বোঝা যায় নতুনভাবে, তাতে জীবনের নতুন পরিচয় ফুটে ওঠে। এ গতির ফলে অতীতের পুরনো বৈশিষ্ট্য ফেলে নতুন রূপ দেখা দেয়। নদীর গতিতেও সে বৈশিষ্ট্য বর্তমান। নদীর পরিচয় তার গতির মধ্যে, স্রোতের মধ্যে। যদি গতি হারিয়ে নদী এক জায়গায় আটকে যায়, তবে তাকে আর নদী বলা যায় না। তখন নাম নদী নয়, বদ্ধ জলাশয় হিসেবে তার পরিচয়; শৈবালে সে জঙ্গলপূর্ণ হয়। তেমনি যদি কোনো কারণে জাতির চলার ছন্দ ব্যাহত হয়, তাহলে সে জাতি তার স্বাভাবিক বিকাশ হারিয়ে বিকৃতরূপ পরিগ্রহ করে। জাতির গতিবেগ যদি থেমে যায় তাহলে জীর্ণ লোকাচার এবং নানা ধরনের কুসংস্কার দ্বারা জাতি বিকারগ্রস্ত হয়। প্রত্যেক জাতিরই থাকে একটি স্বাভাবিক গতি। কোনো জাতি যদি সেই গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে জাতীয় জীবনে দেখা দেয় অবাঞ্ছিত জড়তা। এ জড়তা জাতীয় জীবনের প্রধান অন্তরায়। ...

ভাবসম্প্রসারণ : সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা / আশা তার একমাত্র ভেলা

সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা আশা তার একমাত্র ভেলা আশা বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী শক্তি। মানবজীবন পদে পদে কণ্টকাকীর্ণ। বিপদসঙ্কুল এ জগৎ-সংসারে আশা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না। আশাই মানুষকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে, মনে দেয় সাহস, দেহে দেয় শক্তি। পৃথিবীতে যেমন সুখ আছে তেমনি দুঃখও আছে। সুখ-দুঃখে ঘেরা মানুষের সংসার সাগর। এখানে সুখ যেমন চরন্তন, দুঃখও তেমনি নিত্য। সুখ পেতে হলে মানুষকে বিশাল দুঃখকে পার করতে হয়। একদা শেক্সপীয়রের মুখে ধ্বনিত হয়েছ – ‘Life is not a bed of roses.’ অর্থাৎ, জীবন ফুলশয্যা নয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন সুখের জীবন কারও নয়। মানুষের মনে আশা আছে বলেই মানুষ সব দুঃখ সহ্য করে সুখের দোরগোঁড়ায় পৌঁছতে পারে। সাগরের বুকে যেমন অসংখ্য ঢেউ নেচে বেড়ায়, পৃথিবীর বুকেও তেমনি অপরিমেয় দুঃখ বিরাজ করে। সাগর পাড়ি দিতে ভেলা যেমন একমাত্র সম্বল, দুঃখের পাথার পাড়ি দিতেও আশা তেমনি একমাত্র নির্ভর। এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে কোনো না কোনো কাজে লিপ্ত থাকতে হয়। কারণ জাগতিক পরিধিতে সাংসারিক জীবনে অভাব দেখা দেয়। এ অভাব মেটানোর জন্য মানুষকে অর্থোপার্জনে মনোনিবেশ করতে হয় ও কাজে অব্যাহত থাকতে হয়। কিন্তু কাজ করতে ...

ভাবসম্প্রসারণ : সেই ধন্য নরকুলে লোকে যারে নাহি ভুলে / মনের মন্দিরে নিত্য সেবে সর্বজন

সেই ধন্য নরকুলে লোকে যারে নাহি ভুলে মনের মন্দিরে নিত্য সেবে সর্বজন মূলভাব : মানুষের গর্ভে জন্মালেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। প্রকৃত মানুষ হতে চাই কঠিন অধ্যবসায়। এ সাধনায় উত্তীর্ণ মানুষই প্রকৃত মানুষ। সে ধন্য, সে আরাধ্য, পৃথিবীময় তার জয়গান, লোকের অন্তরে তার বাস, মনের মন্দিরে পায় পূজা, বেঁচে থাকে অনন্তকাল। সম্প্রসারিতভাব : যাঁরা পরোপকারে জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে কীর্তি স্থাপন করে গেছেন তাঁরা কীর্তিমান। তাঁরা মরেও অমর হয়ে আছেন। মানুষ মরণশীল; এটি চিরন্তন সত্য। তবুও যাঁরা কীর্তিমান তাঁরা তাঁদের সেবামূলক সৎকর্মের মাধ্যমে মানবসমাজে বেঁচে থাকেন বহু যুগ ধরে। তাঁদেরকে সাধারণ মানুষেরা মনের মন্দিরে রেখে পূজা করে। মানুষ অমরত্ব প্রাপ্ত হয় তাঁর সৎ কর্মের মাধ্যমে। কর্ম তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে সাধারণ মানুষের অন্তরে চিরদিন। অর্থাৎ যেসব মানুষ নিঃস্বার্থভাবে পরোপকারে আত্মনিয়োগ করেন, মানুষের কল্যাণে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেন- মৃত্যুর পরেও তাঁরা অমর হয়ে থাকেন মানুষের মাঝে। এভাবে কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব তাঁদের সৎকর্মের জন্য অমরত্ব প্রাপ্ত হন। এসব লোকের দৈহিক মুত্যু হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরা অমর। সর্বদাই তাঁরা মানবের অন্তর...

প্রবন্ধ রচনা : আধুনিক জীবনে কম্পিউটার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

↬ কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব ভূমিকা : বর্তমান জীবন একান্তভাবেই বিজ্ঞাননির্ভর। বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন জীবনের প্রতিক্ষেত্রেই মানুষের নানা প্রয়োজন মেটাচ্ছে। কেবল তাই নয়, বিজ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভাঙ্গিতেও আমূল পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞান শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেই সমৃদ্ধ করে নি, তার চিন্তাজগৎকেও প্রভাবিত করেছে। উন্নতির দিকে নিয়ে গেছে মানবসভ্যতাকে। এ উন্নতির মূলে কাজ করেছে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজেকর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তথ্যপ্রযুক্তির এক পরম বিস্ময়কর আবিষ্কার কম্পিউটার। মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে, প্রয়োজনীয় কাজেকর্মে, বিনোদনসহ সকল ক্ষেত্রেই কম্পিউটার অতুলনীয় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। যান্ত্রিক সভ্যতার চালিকাশক্তি হিসেবে কম্পিউটার আজ ঘরে ঘরে স্থান করে নিয়েছে। কম্পিউটারের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এর ব্যাপক ব্যবহার এখন সর্বজন স্বীকৃত। কম্পিউটার কী? : কম্পিউটার বলতে এমন একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে বোঝায় যা অগণিত উপাত্ত গ্রহণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে। ’কম্পিউটার’ শব্দটি ইংরেজি এবং এর অর্থ হলো ‘গণক...

প্রবন্ধ রচনা : বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

↬ বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব ↬ বিজ্ঞান শিক্ষার উপযোগিতা ↬ গঠনমূলক কর্মে বিজ্ঞান ভূমিকা : "We need science more than ever before."                                                     -Holden শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সুপ্ত মানুষ্যত্বের জাগরণ; সৎ ও অসত্যের এবং ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করে আত্মোপলব্ধি। বিজ্ঞান শিক্ষা একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষা হলেও শিক্ষার মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং কোনো কিছু বিশেষরূপে জানার অর্থই যদি হয় বিজ্ঞান তো বিজ্ঞান শিক্ষার অর্থ এমন এক শিক্ষা যা মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষরূপে জানতে সহায়তা করে। আবার এই জানা ব্যাপারটি একদিকে যেমন জ্ঞানের পরিপোষক, অন্যদিকে তেমনি জ্ঞানের বিনাশক। অতএব, বিজ্ঞান শিক্ষা বলতে এমন এক শিক্ষা বোঝায়, যা আমাদের জ্ঞানান্ধকার দূর করে যথার্থ জ্ঞানের আভাস দেয় এবং মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে আত্মোপলব্ধি তথা বিশ্বজগতের স্বরূপ উপলব্ধিতে সহায়তা করে। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব : জীবনে সুখ-স্বাচ্ছ...

প্রবন্ধ রচনা : চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান

↬ চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান ↬ বিজ্ঞান চিকিৎসা শাস্ত্রে আশীর্বাদস্বরূপ ভূমিকা : এখন বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে বহুদূর পর্যন্ত। বিজ্ঞানের অব্যাহত অভিযাত্রা দুনিয়ার মানুষকে দিয়েছে অনেক বিস্ময়কর উপহার, আবার অভাবনীয় মৃত্যুর যন্ত্র বা মারণাস্ত্র। বিজ্ঞান শুধু দানই করে নি, কেড়েও নিয়েছে। আবার সুসাহিত্যিক যাযাবর বলেছেন, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ কেড়ে নিয়েছে আবেগ’ । আবেগ কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। মানবসভ্যতার শুরু থেকে যে দিন মানুষ গুহা ছেড়ে সমতলে এল, গাছের ডাল বেয়ে মর্তে নেমে এল, তখন থেকে বিজ্ঞান পর্যায়ক্রমে দিয়েই যাচ্ছে। প্রথমে দিল আগুন, এর পর চাকা এবং এমনি করে আজকের সবচেয়ে বিস্ময়কর কম্পিউটার পর্যন্ত। মানবসভ্যতার অগ্রসরতা এগিয়েছে বিজ্ঞানের হাত ধরে। আর বিজ্ঞানের অগ্রসরতার চাকা বহুদূর বহুবার ঘুরেছে, পৃথিবীকে দিয়েছে অভাবনীয় পরিবর্তনের বিস্ময়কর স্বাদ। মানবসভ্যতার বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সমোজ্জ্বলতার সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা চিকিৎসাশাস্ত্রকেও বিজ্ঞান নব নব দানে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা জানি “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” অথাৎ, অতিবড় ধনবানেরও শরীর স্বাস্থ্য ভা...

ভাবসম্প্রসারণ : বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসাথে গাঁথা / নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা।

বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসাথে গাঁথা নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা। চোখকে নিরোগ সুস্থ রাখতে চোখের পাতার যেমন বিকল্প নেই। তেমনি কাজকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্রামের প্রয়োজন। কারণ বিশ্রামে শরীরে যে উদ্যম আসে, তা দিয়েই কাজ সম্পন্ন করতে হয়। কর্মময় এ পৃথিবী। এখানে প্রতিটি প্রাণীই শ্রম দিয়ে জীবন বাঁচিয়ে রাখে। পৃথিবীর মানুষ আপন শ্রমের বিনিময়েই পৃথিবীকে নতুন রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। আজকের নতুন সভ্যতা মানুষের বুদ্ধি, কৌশল ও শ্রমের ফসল। কিন্তু শ্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। জীবনে যেমন কর্মের প্রয়োজন আছে তেমনি আছে বিশ্রামের। চোখের পাতা যেমন চোখের অংশ, বিশ্রামও তেমনি কাজের অংশ। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে কর্মের জন্যে দিন ও বিশ্রামের জন্য রাত দান করেছেন। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। কাজেই দেশ, দশ ও বিশ্বকে উন্নত করার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করা আশু দরকার। আজ বিজ্ঞানের চরম ও পরম উন্নতির যুগে জাপানিরা পরিশ্রমী হবার কারণেই টেকনোলজির দিক থেকে আমেরিকা ও রাশিয়ারকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তাদের পরিমিতবিশ্রাম করার প্রবণতা না থাকায় আজ তাঁরা অনিদ্রায় ভুগছে। এমন অনিদ্রা মানুষকে এক সময় অসুস্থ করে তুলতে পারে। পরে স্লিপ...

ভাবসম্প্রসারণ : কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে / দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?

কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে? অথবা, কাঁটাবনের গোলাপই সত্যিকারের গোলাপ। অনায়াসে লব্ধ কোনো জিনিসের চেয়ে কষ্টে প্রাপ্ত জিনিজের মূল্য অনেক বেশি। কঠিন বাস্তবতার পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে যে আরোহণ করতে পারে সেই পায় প্রকৃত জীবনের আস্বাদ। কষ্টে কোনো কিছু অর্জন করলে তার মূল্যায়ন হয় বেশি। কাঁটার আঘাতে রক্ত ঝরিয়ে কাঁটা বন থেকে গোলাপ ফুল সংগ্রহ করায় যে আনন্দ, তার তুলনা নেই। কিন্তু যে গোলাপ নাগালের কাছেই ফুটে থাকে, যাকে যখন তখন হাত বাড়ালেই তুলতে পারা যায় সেটা অতটা আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু প্রচুর পরিশ্রমের মাধ্যমে যা অর্জন করা যায় তা পেয়ে মানুষ দারুণ আন্দ অনুভব করে। যে ছাত্র কঠোর পরিশ্রম করে ভালো রেজাল্ট করে তার আনন্দের সীমা থাকে না। আমাদের চলার পথ উপল বিছানো, কণ্টকাতীর্ণ, সংগ্রামে ভরপুর। সাহসী যোদ্ধার মতো জীবনসংগ্রামে যারা অবতীর্ণ হয় তারাই সফলতা অর্জন করতে পারে; তাদের গলায়ই শোভা পায় বিজয়ের মাল্য। তারাই সাফল্যের মুখ দেখতে পারে। আর যারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যারা উত্তরাধিকারসূত্রেই প্রচুর সম্পদের অধিকারী, যারা না চাইতে অনেক কি...

ভাবসম্প্রসারণ : উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, / তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে

উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে উত্তম চরিত্রের অধিকারীর মনোবল এত দৃঢ় যে সে অধমের সাথে চলতে দ্বিধা করে না, ভয় পায় না কিন্তু যার মনোবল ক্ষীণ সে ছিটকে পড়ার ভয়ে অধমের কাছ থেকে দূরে থাকে। উত্তম আর অধমের মধ্যে যে পার্থক্য ও তফাৎ রয়েছে, মধ্যমের সাথে সে তফাৎ ও পার্থক্য অনেক কম। কেননা, উত্তম ও অধমের মধ্যস্থলেই মধ্যমের স্থান। পথচলা ও জীবনাচরণের ক্ষেত্রেও উত্তম মধ্যম ও অধমের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এদরে মানসিকতাও ভিন্ন। যে উত্তম বা শ্রেষ্ঠ, অধমের সঙ্গে পথ চলতে তার কোনো বাধা নেই। কারণ , তার কোনো সংশয় নেই এবং হীনম্মন্যতা নেই। সে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত। তার ভেতর যে স্পষ্ট, বাইরেও তেমনি স্পষ্ট। অধমের সাথে পথ চলতে উত্তমের মনে কোনো সংশয় থাকে না কারণ, অধমের সাথে তার পার্থক্য ও দূরত্ব খুবই স্পষ্ট। তার পদস্থলনের সম্ভবাবনাও সেখানে থাকে না। কিন্তু সমস্যা হলো মধ্যমের। কারণ, সে যেমন উত্তমের নিকটবর্তী, তেমনি নিকটবর্তী অধমের। সে উত্তম হতে চায়, কিন্তু উত্তম হওয়ার সাধ্য তার নেই। আবার অধম হতে সে মোটেও চায় না। অসলে এই মধ্যম শ্রেণির মানুষের দোদুল্যমানতা ও হীনতাবোধ বেশি। কারণ,...

ভাবসম্প্রসারণ : অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে সুশীল সমাজ গঠনের প্রয়াসী মানুষ ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের বৃহত্তর কল্যাণ ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে গড়ে তুলেছে অনেক মান্য অনুশাসন ও অনুসরণীয় ন্যায়-নীতি। কিন্তু সমাজ জীবনে এমন কিছু লোক থাকে যারা এসব অনুশাসন ও ন্যায়নীতি মান্য ও অনুসরণ করে না; তারা অন্যকে উৎপীড়ন করে, অন্যের অধিকারে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণে সামাজিক শৃঙ্খলাকে নস্যাৎ করে, সামাজিক স্বার্থবিরোধী অন্যায় ও অবৈধ কর্মতৎপরতায় লিপ্ত হয়। এরা সমাজের চোখে অন্যায়কারী ও আইনের চোখে অপরাধী বলে বিবেচিত হয়। এদের অপরাধ অবশ্যই দণ্ডনীয়। কিন্তু বিবেকবান মানুষ হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেতনার অধিকারী হলেও অনেক মানুষ নানা কারণে দিনের পর দিন অন্যায়কে সহ্য করেন। তা কি প্রকারান্তরে অন্যায়কে ইন্ধন দেয় না? তা কি অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার নামান্তর নয়? বস্তুত অন্যায়প্রবণ মানুষ সংখ্যায় কম হলেও এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সঙ্গত মনে করলেও অনেকে বিপদের ঝুঁকি থাকায় নীরবে অন্যায় সহ্য করে চলে। পরিভোগপ্রবণ, সুখকাতর ও আত্মকেন্দ্রিক অনেক মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ ...

ভাবসম্প্রসারণ : আলো বলে, ‘অন্ধকার, তুই বড় কালো’ / অন্ধকার বলে, ‘ভাই, তাই তুমি আলো!’

আলো বলে, ‘অন্ধকার, তুই বড় কালো’ অন্ধকার বলে, ‘ভাই, তাই তুমি আলো!’ আলো ও অন্ধকার পরস্পরের পরিপূরক। এদের একটির অস্তিত্ব ও মূল্য নির্ভর করে অন্যটির ওপর। অন্ধকার আছে বলেই আলোর এত মুল্য, এত ঔজ্জ্বল্য। কালো আঁধারের পটভূমিতেই উদ্ভাসিত হয় আলোর মহিমা। আলো ও আঁধারের যুগল অস্তিত্ব প্রকৃতি ও জীবনের বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরে। বিশ্বজগতে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা প্রভৃতি বিপরীতধর্মী ব্যাপারের মতোই আলো ও আঁধার পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বিপরীতধর্মী ব্যাপার। এদের একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব নিরর্থক ও তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। দুঃখ সয়েই আমরা সুখের আনন্দ ও মহিমাকে উপলব্ধি করি। মন্দ আছে বলেই ভালোর এত সমাদর। নিন্দনীয় মিথ্যাকে ছাপিয়ে ওঠে বলেই সত্য পায় নন্দিত মহিমা। এভাবে যা-কিছু আমরা মন্দ, পরিত্যাজ্য, অপ্রাপ্যনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করি, সেসব কোন না কোনভাবে বিশ্বজগতের অপরিহার্য সত্য হিসেবে বিরাজ করছে। আলো পৃথিবীকে কর্মচঞ্চল রাখে। আর অন্ধকার কর্মক্লান্ত মানুষের জীবনে নিয়ে আসে বিশ্রামের সুযোগ। তাই অন্ধকারকে কালো বলে যে কেউ নিন্দা করুক তাকে নিন্দা করার কোন অধিকার আলোর নেই। কারণ, অন্ধকার না থাকলে আলো তার...

ভাবসম্প্রসারণ : কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি- / তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি

কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি- তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি অথবা দেখিতে যা বড়, চক্ষে যাহা স্তূপাকার হইয়াছে জড়ো, তারি কাছে অভিভূত হয়ে বারে বারে লুটায়ো না আপনায়। মহৎ প্রতিভা এবং মহান সুকৃতি আত্মপ্রচারের অপেক্ষা রাখে না। গুণমুগ্ধ অনুসারী, উপকৃত উত্তরাধিকারী এবং ঘনিষ্ঠ সুহৃদজনের কাছে তা পায় অকুণ্ঠ স্বীকৃতি। আর তার প্রকাশও স্বতঃস্ফূর্ত। আত্মপ্রচার এক হাস্যকর আস্ফালন, তা ব্যক্তির অন্তঃসারশূন্য রূপটিকেই প্রকট করে তোলে। মানুষের যে অহংকার থাকে না, তা নয়। যে অহংকার আত্মবিশ্বাস যোগায়, তার প্রকাশ হয় বিনীত, পরিমিত ও রুচিশীল। জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি নিজের গুণগত বৈশিষ্ট্যেই হন আলোকিত মানুষ। তাঁর নিজের ক্ষমতা জাহিরের প্রয়োজন হয় না। তাঁদের সুকৃতির আলোতেই লোকে তাঁদের পরিচয় পায়। কিন্তু যাদের কোন সুকৃতি নেই তারাই প্রচারসর্বস্ব পন্থায় নাম কেনার জন্যে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সূর্যের আলো যেমন স্বতঃদীপ্ত, ফুলের সুবাস যেমন স্বতোৎসারিত, মানুষের স্বভাবজাত ও অর্জিত গুণাবলিও তেমনি। প্রকৃত গুণীব্যক্তির তাই স্বীকৃতি পাবার জন্যে বাড়তি চেষ্টার প্রয়োজন নেই। তাই দেখা গেছে, প্রকৃত ধীমান কখনো অহেতুক আত্মপ্রচারের কৌশলী পন্...

ভাবসম্প্রসারণ : চক্ চক্ করলে সোনা হয় না

চক্ চক্ করলে সোনা হয় না মূলভাব : বাইরের চাকচিক্য ও সাজসজ্জা দেখে কোনো কিছুকে গুণসম্পন্ন বা মূল্যবান মনে করা উচিত নয়। সম্প্রসারিত ভাব : বিশ্ব সংসারে আপাত সুন্দর অন্তঃসারশূন্য বস্তুর অভাব নেই। সর্বত্রই নকল অসার আড়ম্বরপূর্ণ বস্তু ছড়িয়ে আছে। যা সহজে চেনা কঠিন। যেমন -মাকাল ফল দেখতে সুন্দর কিন্তু ভেতরে শুধু ছাই। তাই কুহেলিকায় মুগ্ধ হয়ে অজ্ঞান মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং মানব জীবনকে তুচ্ছ করে দেয়। স্বর্ণ মূল্যবান ধাতু এটা দেখতে খুব উজ্জ্বল। তামা এবং পিতলকে ভালোভাবে ঘষামাজা করলে সোনার মতো উজ্জ্বল দেখায়। তাই বলে সেগুলো সোনার মতো দামি নয়। এ রকম আমাদের জগৎ সংসারে অনেককে বাইরের রূপ দেখে প্রকৃত রূপ মনে করা ঠিক নয়। কথায় আছে কোনো ব্যক্তির মুখে ধর্মের বুলি উচ্চারণ করলেই সে ধার্মিক হবে এমন ভাবা ঠিক নয়। অনেক সময় স্বার্থ সাধন ও গুণবান ব্যক্তির মতো অভিনয় করে। সুতরাং মিথ্যা মূল্যহীন। চক্ চকে বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে রূপহীন প্রতিভাবান ব্যক্তির অন্বেষণ করাই জ্ঞানীর কাজ। চাকচিক্য মানুষের আসল পরিচয় নয়। কেননা, চক্ চক্ করলেই তা দেখে সোনা ভাবা বুদ্ধিমানের বৈশিষ্ট্য নয়। এমন মনে করলে ব্যক্তিগত ও সমাজজী...

ভাবসম্প্রসারণ : গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন / নহে বিদ্যা, নহে ধন, হলে প্রয়োজন

গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন নহে বিদ্যা, নহে ধন, হলে প্রয়োজন মানুষের জীবন বিদ্যা ও ধন দুটোই খুব প্রয়োজন এবং মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানোর জন্যে এ দুটোকে মানুষ কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে অর্জন করে। কিন্তু শুধু অর্জন করার মধ্যেই এ দুটোর সার্থকতা সীমিত নয়। বিদ্যা অর্জন করার পর তাকে চলমান জীবন-প্রবাহে কাজে লাগাতে না পারলে সে বিদ্যা হয়ে পড়ে অকার্যকর। আবার অর্জিত ধন-সম্পত্তি যদি প্রয়োজনের সময় কাজে না লাগে তবে সেই ধন-সম্পত্তি কষ্ট করে অর্জন করাই বৃথা। পৃথিবীতে মানুষের জীবনে বিদ্যাশিক্ষা ও ধন-সম্পত্তি অর্জনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বইয়ে বিদ্যা সঞ্চিত থাকে, মানুষ চর্চার মাধ্যমে তাকে আত্মস্থ করে। বিদ্যা অর্জন করতে হলে মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়, সাধনা করতে হয়। কিন্তু কেউ যদি রাশি রাশি বই-পুস্তক কেবল তোতাপাখির মতো মুখস্ত করে তবে সেই পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নিরর্থক। আবার অর্জিত বিদ্যা যদি মানব কল্যাণে কাজে না লাগে তবে তাও সার্থক হয় না। মলাটবদ্ধ নির্জীব বিদ্যাকে আত্মস্থ করে মানুষ তার মনোজগতের দ্বার উন্মোচন করে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। এর দ্বারাই মানুষ দেশ ও দশের কল্যাণে ব্রতী হয়। বিদ্যা অর্জন করে শুধু পৃথি...

ভাবসম্প্রসারণ : চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, / কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে।

চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে। মহৎ যাঁরা, পরহিতব্রতী যাঁরা, তাঁরা নিজেকে বিলিয়ে দেন জগৎ ও জগৎবাসীর কল্যাণে। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা, নিন্দা ও কালিমা যদি কিছু থাকে তবে তা তাঁরা একাকী বহন করেন, সর্বদা সচেষ্ট থাকেন সেই বিষ যেন অন্যকে স্পর্শ না করে। সমস্ত বিষজ্বালা সয়ে তাঁরা বিশ্বমানবকে দান করেন হিরন্ময় আলো। সে আলোতে মানুষের জীবন হয় আলোকিত। আকাশের চাঁদ যেমন তার কলঙ্ককে যথাসম্ভব ঢেকে রেখে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার শুভ্রতা চড়িয়ে ঘুচিয়ে দেয় পৃথিবীর মালিন্যের অন্ধকার, মহামনীষীদের জীবনও তেমনি। তাঁরা ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো অপরিসীম দুঃখ-ক্লেশ ভোগ করেন, অসম্মান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেন, স্থলন ও ত্রুটিতে জড়িয়ে যান। কিন্তু তার বিন্দুমাত্রও তাঁরা অন্যকে স্পর্শ করতে দেন না। তাঁরা অপরিসীম গুণাবলি দিয়ে সেসব দুঃখ-ক্লেশ আড়াল করেন। অপরিসীম মমতা ও আন্তরিকতা দিয়ে অন্যের দুঃখ মোচনে ব্রতী হন, দুঃস্থ মানবতার জন্যে নিজের স্বস্তি বিলিয়ে দেন, অন্যের বিপদে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেন না, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করেন, মহৎ সাধনায় অনুপ্রাণিত করেন বিশ্বজনক...

ভাবসম্প্রসারণ : জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, / সে জাতির নাম মানুষ জাতি। / একই পৃথিবীর স্তন্যে লালিত, / একই রবিশশী মোদের সাথী। অথবা, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই

জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি। একই পৃথিবীর স্তন্যে লালিত, একই রবিশশী মোদের সাথী। অথবা সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত। প্রকৃতির সন্তান মানুষ আপন জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিতে প্রকৃতিকে করেছে করায়ত্ত, আপন শ্রম, সৃজনীশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় জগতে অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠত্বের আসন। এই কৃতিত্ব কোনো বিশেষ জাতি-সম্প্রদায়, গোষ্ঠী বা শ্রেণীর নয়। এ অর্জন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির। প্রকৃতির রাজ্যে সকল মানুষ অভিন্ন বৈশিষ্ট্য গড়া। একই পৃথিবীতে, একই আকাশের নিচে মাটির আঙিনায়, একই চন্দ্র-সূর্যের আলোয় তারা বাঁচে, একই আলো-বাতাসে তারা লালিত-পালিত হয়। তাদের অনুভূতির জগৎ অভিন্ন। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার বোধে তাদের মধ্যে নেই কোনো পাথৃক্য। তাদের রক্তের উষ্ণতা ও রং এক। দুঃখে-শোকে সবার অশ্রুধারাই হয় লবণাক্ত। ধর্ম-বর্ণ, আকৃতি-প্রকৃতিতে যত ভিন্নতা থাকুক, পৃথিবীতে সকল মানুষের পরিচয় সে মানুষ। সেখানে দেশ-কালগত কোনো পার্থক্য নেই। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। কিন্তু ক্ষমতান্বেষী শাসক-শোষকরা যুগে যুগে মানুষে মানুষে বপন কর...

ভাবসম্প্রসারণ : দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে / সর্বশ্রেষ্ঠ যে বিচার

                                  দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ যে বিচার                                ন্যায়বিচার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যাপার। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রবণতা রোধ করার স্বার্থে অপরাধীর দণ্ডদানের ক্ষেত্রে আবেগ বা ভাবালুতার যেমন স্থান নেই, প্রতিহিংসা বা কোনো পূর্বধারণার প্রভাবও পরিহার্য। অবিচল ধৈর্য এবং নিরপেক্ষভাবে বিচার করাই কাঙ্ক্ষিত, যদি অপরাধীকে দণ্ডিত করতে হয়, তা ক্রোধ বা ঘৃণা সহযোগে না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এতে অবিচারের সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার সঙ্গে সহানুভূতির মাত্রা যোগ হলেই বিচার মানবিক রূপ পায়, এর শ্রেষ্ঠত্ব তখনই। আধুনিক সমাজে বিচারের মূল লক্ষ্য প্রকৃত অপরাধীর যথাযোগ্য শাস্তি বিধান এবং সেই সঙ্গে নিরপরাধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য তখনই সাধিত হবে যখন বিচারে প্রামাণিক সাক্ষ্য ও মানবিক বিবেচনার সমন্বয় ঘটবে। পূর্বধারণার প্রভাবদুষ্টতা তো বটে...

ভাবসম্প্রসারণ : দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি / সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?

দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি? মানুষের জীবনের পথ সত্য-মিথ্যায় আকীর্ণ। সত্য-সন্ধানী মানুষ চান মিথ্যার কুহকে পথভ্রান্ত না হতে। কিন্তু সত্যকে পাওয়ার কোনো সহজ ও চেনা রাস্তা নেই। জীবনে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সত্য-মিথ্যার যাচাই হয়। তাই মিথ্যার ছলনার ভয়ে জগৎ ও জীবনবিমুখ হয়ে কেউ যদি কর্মজীবনে পা না বাড়ান তবে মিথ্যাকে হয়তো ঠেকানো যায়, কিন্তু সত্যকে উপলব্ধি করা যায় না। জগতে ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দরের মতো সত্য-মিথ্যা পাশাপাশি অবস্থান করে। সত্যের পথ মানুষকে আলোকিত করে আর মিথ্যার পথ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। একদল গোঁড়া সত্য-সন্ধানীদের ধারণা, জগৎ সংসার মিথ্যা কুহকে ভরা। তাই তাঁরা সদাচারের নিয়মনিষ্ঠ সাধনায় ব্রতী হয়ে জগৎ সংসার ও জাগতিক মোহবন্ধনকে পরিহার করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের ভয়, তা না হলে মানুষ ভুলের মোহে পথভ্রান্ত হবে। কিন্তু এভাবে মিথ্যাকে ঠেকাতে গেলে বাস্তবের সঙ্গে জীবনের বাস্তব যোগ ঘটে না। ফলে শেষ পর্যন্ত জীবনের সত্য উপলব্ধি করাও সম্ভব হয় না। বস্তুত, জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মানুষ সত্য মিথ্যাকে চিনতে শিখে। চিন্তা ও কাজে নানা ভুলভ্রান্তির মধ্য...

ভাবসম্প্রসারণ : ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে, / ধ্বনি-কাছে ঋণী সে যে গাছে ধরা পড়ে

ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে, ধ্বনি-কাছে ঋণী সে যে গাছে ধরা পড়ে আত্মসুখপরায়ণ, সুযোগসন্ধানী অকৃতজ্ঞরা উপকারীর কাছ থেকে প্রভূত উপকার পেয়েও তা স্বীকার করতে চায় না। তারা মনে করে অন্যের ঋণ স্বীকার করলে বুঝি বা নিজেদের দুর্বলতার কথা প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই তারা উপকারীর ঋণ স্বীকারের চেয়ে তাদের নিন্দাতে শতমুখ হয়ে ওঠে। এ ধরনের আচরণ হীনতার পরিচায়ক ও নিন্দনীয়। সবাই জানে, ধ্বনি থেকেই প্রতিধ্বনির সৃষ্টি। ধ্বনির অস্তিত্ব ছাড়া প্রতিধ্বনির অস্তিত্বের প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু প্রতিধ্বনি তা বিস্মৃত হয়ে উপহাস-বিদ্রুপে ধ্বনিকে জর্জরিত করে। ধ্বনির প্রতি প্রতিধ্বনির এই বিদ্রুপ থেকে বুঝতে দেরি হয় না যে, প্রতিধ্বনি ধ্বনির কাছে তার অপরিশোধ্য ঋণকে কেবল অস্বীকার করে না, নিজের শূণ্য-গর্ভতাকেও চাপা দিতে প্রয়াসী হয়। সমাজ-সংসারে এ ধরনের অকৃতজ্ঞতার উদাহরণ বিরল নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উপকারী অপকারীর নিন্দায় মুখর। এমনিভাবে নিবেদিতপ্রাণ দেশব্রতী, মহান ধর্মসাধক, আত্মত্যাগী সমাজসেবী, মহান হৃদয় পরহিতব্রতী, নিঃস্বার্থ জননায়ক দেশ-জাতি-সমাজ ও মানুষের স্বার্থে মহান অবদান রেখেও প্রতিদানে পেয়েছেন অপমান ও লাঞ্ছনা। ...

ভাবসম্প্রসারণ : নদীর এপাড় কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস / ওপাড়েতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস

নদীর এপাড় কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ওপাড়েতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস অতৃপ্তি মানবচরিত্রের একটি স্বভাবধর্ম। অধিকাংশ মানুষই স্বীয় অবস্থায় সুখী ও সন্তুষ্ট নয়। সুখী মানুষও নিজের চেয়ে অন্যকে মনে করে বেশি সুখী। শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে, কিংবা নিয়তির প্ররোচনায় আরাধ্য অর্জিত হচ্ছে না- এই ধারণা লালন করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেকেই। অন্যের সৌভাগ্যকে চক্ষুশূল করে ঈর্ষাকাতর হয় মানুষ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, লাভ-ক্ষতি সবার জীবনেরই অঙ্গ, সবার জীবনেই আসে অপ্রত্যাশিত সুযোগ, আবার অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয় মানুষ- এই সরল সত্য উপলব্ধি না করে মানুষ অন্যের অবস্থার প্রতি ঈর্ষাকাতর দৃষ্টিপাত করে। সে ঈর্ষা নতুন দুঃখের, অহেতুক অতৃপ্তি আর হীনম্মন্যতারই জন্ম দেয়। এই বিচিত্র স্বভাবের দৃষ্টান্ত একেবারে সহজ দৃশ্য। পর্ণকুটিরের অধিবাসী যেমন প্রাসাদোপন অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের বিরূপ ভাগ্যের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে, বিসম্ময়কর হলেও সত্যি যে, বিপুল অর্থ-বিত্তের অধিকারী সেই প্রসাদোপম অট্টালিকাবাসীও গরিবের ছিমছাম, শ্রীহীন বাড়ির দিকে তাকিয়ে নিরুপদ্রপ শান্ত জীবনের পরম সুখের অলীক কল্পনা করে তৃপ্তি বোধ করে। পরকে ...

ভাবসম্প্রসারণ : মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে / মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। সুন্দর প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালবাসা যেমন চিরন্তন তেমনি মানুষের প্রতি মানুষের আকর্ষণও অপরিসীম। তাই মরণশীল মানুষ প্রকৃতি ও মানুষের সান্নিধ্যময় মানবজীবন থেকে বিদায় নিতে চায় না। জগতে অনন্তকাল ধরে জীবন উপভোগের আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। প্রকৃতির অপূর্ব রূপবৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের জীবনের রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন। প্রতিটি মানুষ জন্ম নেয় প্রকৃতির কোলে। আর প্রকৃতির অপার সম্পদ ব্যবহার করেই সে জীবন ধারণ করে। মাটির পৃথিবীর আলো- বাতাস-জলে সে পায় অমৃতের স্বাদ। অন্যদিকে পৃথিবীতে মানুষ নিঃসঙ্গ বা একাকী বাঁচতে পারে না। চারপাশের মানুষের স্নেহ-মমতা ও প্রীতির ডোরে সার্থক ও ধন্য হয় তার জীবন। তাই প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা চিরন্তর। পার্থিব জীবনে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে থেকে মানুষ এত আনন্দিত ও এত মুগ্ধ যে স্বর্গের আকর্ষণ তার কাছে তুচ্ছ। তাই সে পৃথিবীকে ছাড়তে চায় না, মৃত্যুকে বরণ করতে চায় না। কিন্তু মানুষ জানে, তাকে একসময় না একসময় মৃত্যুকে বরণ করতে হবে। ছেড়ে যেতে হবে এই সুন্দর পৃথিবীকে, ছেড়ে যেতে হবে প্রিয় মানুষগুলোকে। এ...